সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ - ১০:৪৬
কা’বা ঘর তাওয়াফের চেয়েও যখন মুমিনের সেবা অগ্রাধিকার পায়

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইরানের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও দারসে আখলাক তথা নৈতিক শিক্ষার বিশিষ্ট উস্তাদ আয়াতুল্লাহ হায়েরি শিরাজী (রহ.) একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক নীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহর নির্দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি কাজই আল্লাহর বেলায়াতের অধীন। আর আল্লাহর বেলায়াতের অধীন কাজের বৈশিষ্ট্য হলো—তা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিচালিত করে।

আয়াতুল্লাহ হায়েরি শিরাজী (রহ.) তাঁর একটি দারসে আখলাকে ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করে মুমিনদের সহযোগিতা করা এবং তাদের প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, মুমিনের সমস্যা দূর করা ও তার প্রয়োজন পূরণ করা এমন একটি কাজ, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যায়।

আল্লাহর বেলায়াত: অন্ধকার থেকে আলোর পথে
আয়াতুল্লাহ হায়েরি শিরাজী (রহ.) বলেন, আল্লাহ তাআলার নির্দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়ই ‘বেলায়াতুল্লাহ’ বা আল্লাহর বেলায়াতের অধীন। এর স্বাভাবিক ফল হলো—মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাওয়া।

অর্থাৎ, শরিয়ত যেসব কাজের নির্দেশ দিয়েছে, সেগুলো মানুষকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর পথে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম।

ইমাম সাদিক (আ.)-এর একটি তাৎপর্যপূর্ণ বর্ণনা
এক ব্যক্তি বর্ণনা করেন, হজের সফরে তিনি ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর সঙ্গে ছিলেন। এ সময় মসজিদুল হারামে তাঁর এক বন্ধু দূর থেকে ইশারা করে তাঁকে কাছে যেতে বলছিলেন। কিন্তু তিনি তখন ইমামের সঙ্গে ছিলেন এবং তাওয়াফ করছিলেন। তাই বন্ধুর ইশারায় সাড়া দেননি।

ইমাম সাদিক (আ.) তাঁকে বললেন, “সে তো তোমাকে ইশারা করছে।”

আমি বললাম, ‘জ্বি, সে আমাকে ইশারা করছে।’

ইমাম (আ.) বললেন, “তাহলে তুমি তার কাছে যাচ্ছ না কেন?”

আমি বললাম, ‘আমি তাওয়াফ করছি।’

তখন ইমাম (আ.) বললেন, “তাওয়াফের এই স্থানটি চিহ্নিত করে রাখো। যাও, তার প্রয়োজন পূরণ করে এসো। এরপর ফিরে এসে তাওয়াফের বাকি অংশ সম্পন্ন করো।”

এরপর ইমাম (আ.) মুমিনের প্রয়োজন পূরণের জন্য তাওয়াফ সাময়িকভাবে বিরতি দেওয়ার যে বিপুল সওয়াব রয়েছে, তা এত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন যে বর্ণনাকারী এ কাজের মর্যাদা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন।

মুমিনের বিপদ দূর করা ইবাদতেরই অংশ
এর একটি বাস্তব উদাহরণ হতে পারে—কোনো শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য কেউ আপনার সাহায্য চাইল। এমন পরিস্থিতিতে তাকে সহযোগিতা না করে নিজের ইবাদতে ব্যস্ত থাকা সমীচীন নয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা কিংবা কোনো মুমিনের গুরুতর বিপদ দূর করার জন্য নফল ইবাদত সাময়িকভাবে ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ।

অর্থাৎ, এমন পরিস্থিতিতে নফল ইবাদত এমন কোনো বিষয় নয়, যার কারণে একজন বিপদগ্রস্ত মানুষের জরুরি প্রয়োজন উপেক্ষা করা যায়। বরং শরিয়তসম্মত ও মানবিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বড় সুযোগ রয়েছে।

শুধু সময় দেওয়া নয়, সাহায্য চাওয়ার সুযোগও করে দেওয়া
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা রয়েছে। বিষয়টি শুধু প্রয়োজনের সময় কাউকে সময় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এমন একটি মানবিক পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি, যেখানে বিপদগ্রস্ত বা প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষ নির্দ্বিধায় আপনার কাছে সাহায্য চাইতে পারে।

কিছু মানুষ এমন, যাদের কাছে প্রয়োজনগ্রস্তরা সহজেই নিজেদের প্রয়োজনের কথা বলতে পারে। অর্থাৎ, কারও কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে বা সে বিপদে পড়লে সাহায্যের জন্য তাদের কাছে যেতে সে সংকোচ বোধ করে না।

আবার কিছু মানুষ এমনভাবে নিজেদের চারপাশে দূরত্বের দেয়াল তৈরি করে রাখেন যে প্রয়োজনগ্রস্ত কেউ তাদের কাছে সাহায্য চাইতে সাহস পায় না। তাদের আচরণ ও ব্যবহারে এমন এক ধরনের বাধা তৈরি হয়, যার কারণে মানুষ নিজের প্রয়োজনের কথা বলতেও সংকোচ বোধ করে।

আয়াতুল্লাহ হায়েরি শিরাজীর (রহ.) বক্তব্যের মর্ম হলো—একজন প্রকৃত মুমিন শুধু নিজে ইবাদত-বন্দেগিতে মনোযোগী থাকবেন না; বরং অন্য মুমিনের প্রয়োজন ও কষ্টের প্রতিও সংবেদনশীল থাকবেন। কারণ, আল্লাহর নির্দেশ পালনের অংশ হিসেবে মানুষের সেবা ও তার প্রয়োজন পূরণ করাও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তাই মুমিনের সেবা শুধু তার প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোর নাম নয়; বরং এমন উদার, সহানুভূতিশীল ও সহজ-সরল আচরণ গড়ে তোলাও এর অংশ, যাতে কোনো বিপদগ্রস্ত মানুষ প্রয়োজনের মুহূর্তে নির্ভয়ে আপনার দ্বারস্থ হতে পারে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha